রওনক সাহেব এক পড়ন্ত বিকেলে তার দোতলার মাকড়সার জালাক্রান্ত প্লাস্টার খসে খসে পড়া ওয়েটিং রুমটাতে বসে একটা গল্পের প্লাটফর্ম তৈরি করছিলেন। হঠাৎ কানে এলো বাইরে কিছু মানুষের চিৎকার। লেখা রেখে উঠে দাঁড়ালেন। দ্রুত জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকালেন। দেখেলেন দশ বারো জনার একটা মিছিল। মিছিলের কিছু শব্দ তার কানে এলো, ‘রওনক তুমি সাবধান হও, নইলে তোমায় মরতে হবে।’
তিনি কিছু বুঝে না ওঠার আগেই জানালা দিয়ে একটা ছোট ইটের খোয়া এসে তার কপালে লাগলো। ইস্ করে কপালের আঘাতপ্রাপ্ত স্থানটাতে ডান হাত দিয়ে চেপে নীচে বসে পড়লেন।
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর পুরোনো পাঞ্জাবির ঝুলটা ছিঁড়ে মাথায় একটা প্যাঁচ দিয়ে বাঁধতে বাঁধতে বিড়বিড় করে ড়লতে লাগলেন, এই হলো হুজুগে বাঙালির স্বভাব। কিছু না জেনে, না শুনে, না বুঝে অন্যের কথায় প্ররোচিত হয়ে দল বেঁধে তেড়ে আসা।
কেউ একটা কিছু করলে যদি আরেকজনের মতের বিরুদ্ধ যায় তবে তো আর কথাই নেই। দল গুছিয়ে তেড়ে আসে। ভিতরে ঢুকে দেখে না জিনিসটা সত্য কি মিথ্যা।
রওনক সাহেবের মাথাটা বেশ কেটে গেছে। মাথা পেঁচিয়ে বাঁধা কাপড়টা বেয়ে রক্ত ঝরছে।
ঐ অবস্থায়ই তিনি নীচে নেমে এলেন। লোক গুলোকে কাছে ডাকলেন।
বললেন, কি এমন হয়েছে বলো তো! কেন তোমরা আমাকে নিয়ে মিছিল করছো? কেন মারমুখী হয়ে ইট পাটকেল ছুড়ছো। এটা কি কোনো ভদ্রতার মধ্যে পড়ে? তোমাদের উদ্দেশ্যটা আমাকে একটু বুঝিয়ে বলো তো।
সামনে থেকে কয়েকজন বললো, এর কারণ আপনি নিজেই ভালো জানেন। আপনিই করেছেন আবার আপনাকে কারণ বলতে হবে?
কি করেছি আমি?
একজন এগিয়ে এসে বললো, আপনি আপনার ব্লগে কিছু বিতর্কিত লেখা ছেপেছেন যা আমাদের ধর্ম এবং ধর্মগুরুদের বিরুদ্ধ। আপনি আমাদের ধর্মগুরুদের সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য ছেপেছেন।
-তোমরা কি কেউ পড়েছো সে লেখাটা?
-আমরা পড়িনি। তবে শুনেছি অন্যদের কাছ থেকে।
-একেই বলে হুজুগে বাঙ্গালী। দেখো আমরা অনেক কিছুই না জেনে, না পড়ে হুজুগে মাতি। আবার জানলেও অনেক সময় ভুল জানি। আমাদের চোখের সামনে এমন অনেক কিছুই ঘটছে যেগুলো সত্য মনে হলেও তার পিছনে থাকে আরেক সত্য। আমরা সে সত্যের ধারেকাছ পর্যন্তও পৌঁছাতে পারি না।
আমাদের এক একজনের বোধ এক এক রকমের। এক একজনের চেতনা এক এক রকমের। সে সেই চেতনা থেকে ভাবে। সে সেই বোধ থেকে ভাবে। সেই ভাবনা থেকেই সে লেখে। সুতরাং একজনের লেখা সম্পর্কে জানতে হলে সেই মোটিভ সম্পর্কে জানতে হবে। লেখাটার গভীরে ঢুকতে হবে।
চলো আমরা আরও কথা বলব। সবাই আমার সাথে আমার উপরের রুমে চলো। ধীরস্থিরভাবে বসে আগে আমার সব কথা শোনো, বোঝো। তারপর তোমরা যা ভালো মনে করো তাই করবে।
প্রথম প্রথম অনেকে রাজি না হলেও কিছুক্ষণের মধ্যে রওনক সাহেবের মিষ্টভাষী ব্যবহারে সবাই তুষ্ট ও শান্ত হলো। তার কথামতো সবাই তার সাথে উপরে গিয়ে তার শত ছিন্ন ওয়েটিং রুমে বসলো।
রওনক সাহেব এবার তার কথা শুরু করলেন। বললেন তোমাদের সব প্রশ্নের উত্তর পাবে তার আগে আমার অতিত জীবনের কিছু কথা শোনো। হয়তো তার মধ্যেই তোমাদের উত্তরগুলো নিহীত আছে।
আমি এক প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তান। মাত্র পনেরো বছর বয়সী আমার গর্ভধারিনী মা আমার জন্মের পরপরই অপ্রাপ্ত বয়সে সন্তান ধারণের অভিশাপ নিয়ে মারা যান। আমি নানীর কাছে মানুষ হয়েছি। বাবা আবার বিয়ে করে নতুন সংসার পাতে। বড় হয়ে আমি আমার সৎ মায়ের যন্ত্রণা হাড়ে হাড়ে টের পেতে থাকি।
এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে এসেও সেই বাল্য বিবাহ প্রথা এখনও বহাল তবিয়তে চলছে। এখন আমি যদি সেই বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে কলম ধরি সেটা কি আমার অপরাধ?
ছোটবেলা থেকেই আমি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলাম কিন্তু ছিলাম প্রচন্ড একরোখা। কোনো কিছু পরীক্ষীত সত্য ছাড়া কিছুতেই বিশ্বাস করতে রাজি ছিলাম না। অন্ধ বিশ্বাস আমাকে কখনও কাবু করতে পারেনি, আজও পারে না। কল্পনার উপর ভর দিয়ে চলা আমার একেবারে স্বভাব বিরুদ্ধ।
একবার আমার সৎ বোনটা এক অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটে। আমার সৎ মা জ্বিনে পেয়েছে বলে জ্বিন ঝাড়াতে এক ধর্মীয় গুনীন ডাকে।
আমি বাবাকে বললাম, বাবা ও সিজোফ্রেনিয়ার রোগী, ওকে মানসিক ডাক্তার দেখাতে হবে। গুনীন কি করবে? বাবা-মা আমাকে ভুল বুঝে আমার ওপর চড়াও হয়। ঐ গুনীন দ্বারাই তার ঝাড়ফুঁক চালালো। ধর্মীয় গুনীন একদিকে যেমন ঝাড়ফুঁক দেয় অন্যদিকে বোনের গায়ে তেল মালিশের নামে তার নগ্ন বাসনা চরিতার্থ করতে চায়। আমি এসব দেখে ঐ ধর্মীয় লেবাসধারী গুনীনের উপর ক্ষেপে যাই । কিন্তু বাবা-মা’র আস্কারা পেয়ে ঐ গুনীন এমন চিকিৎসা করতে থাকলো যে শেষ পর্যন্ত বোনটা একদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।
এখন যদি আমি ঐসব ধর্মীয় লেবাসধারী গুনীনদের বিরুদ্ধে কলম ধরি তবে কি আমার অপরাধ?
আমি টিউশনি করে পড়ালেখা করেছি। অন্যের বাড়ি লজিং থেকেছি। আমার বাবা ঐ সৎমায়ের বুদ্ধিতে আমাকে পড়ালেখা বাদ দিয়ে একটা মটর সাইকেলের গ্যারেজে কাজ শিখাতে পাঠিয়েছিলেন। বাবা বলেছিলেন গরীব মানুষ আমরা। অতো পড়ালেখা শিখে কি হবে। হাতের কাজ শেখো।
রক্তে যার জ্ঞানের পিপাসা তাকে আঁটকায় কে? আমি সেখান থেকে পালিয়ে যেয়ে দূরে এক বাড়ি লজিং থেকে পড়ালেখা শুরু করলাম। মেধাবী ছাত্র হওয়ার সুবাদে স্কুলের শিক্ষকদের অকুণ্ঠ সহযোগিতা পেয়েছিলাম। আমি যখন মাধ্যমিকে সারা বোর্ডে তৃতীয় স্ট্যান্ড করলাম তখন সবাই হতবাক হয়ে গেল। বাবা-মা আমাকে বাড়িতে ফিরে আসতে অনেক পিড়াপিড়ি করলো । কিন্তু আমি বাড়ি ফিরে যাইনি।
উচ্চ মাধ্যমিকেও টিউশনি করে পড়েছি তবুও বোর্ডে পঞ্চম স্ট্যান্ড করেছিলাম।
তারপর বুয়েটে চান্স পেলাম। জীবন পাল্টে গেল। তখন অনেক বন্ধু, অনেক প্রিয়জন কাছে ভিড় জমালো। একদিন যারা আমাকে বিদ্রুপ, ব্যঙ্গ করেছে আজ তারাই আমার বড় শুভানুধ্যায়ী হয়ে উঠলো।
বুঝলাম আপনজন সম্পর্কের সংজ্ঞাটা জীবনের সাফল্যের সাথে উঠানামা করে।
যাইহোক অনেক চড়াই উৎরাই পার করে প্রকৌশলী পাশ করলাম। বলে রাখা ভালো এর মাঝে অনেক মেয়ের বাপ-মায়েরাও যোগাযোগ করেছে আমার সাথে তার মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার জন্য। এমনকি পড়ালেখার খরচ খরচাও তারা বহন করতে চেয়েছে। কিন্তু আমি রাজি ছিলাম না। আমার সততা, নিষ্ঠা, চেতনা বারবার আমাকে ভালো মানুষ হওয়ার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করেছে।
বি সি এস পরীক্ষা দিয়ে প্রথম শ্রেণীর সরকারি চাকরি পেলাম।
প্রেম করে বিয়ে করেছিলাম। বিয়ের আগে নীলু কত কথা দিয়েছিলো, কত কমিন্টমেন্ট করেছিলো। আমি বারবার বলেছিলাম আমি কিন্তু আমার নীতির সাথে আপোষ করব না। ভালো করে জেনে বুঝে আমার সাথে গাঁট বাধার চিন্তা করো। উচ্চশিক্ষিত নীলু আমার সব শর্ত মেনেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলো।
কিন্তু হয়তো যে নীতিতে অটল থাকে, বোধের জায়গা পরিচ্ছন্ন রাখে তার সংসার জীবন সুখের হয় না। আমারও হলো না।
বিয়ের পর আমার স্ত্রী নীলু চেয়েছিলো যেন তেন প্রকারেনো টাকা আর শুধু টাকা। আমি বড় ইঞ্জিনিয়ার, বিশাল ক্ষমতার অধিকারী। সুতরাং টাকার পাহাড় জমবে সেটাই তার আশা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। আমি জ্ঞানতঃ পয়োঃপ্রক্ষালন ছাড়া কখনো বাম হাতকে ব্যবহার করিনি। বহু হুমকি ধামকি শুনেছি, বহুবার কর্তৃপক্ষে আক্রোশের শিকার হয়ে রিমোট প্রান্তে ট্রান্সফার হয়েছি, ওএসডি হয়েছি তবু চেতনাকে বিক্রি করিনি।
নীলু বিলাসী জীবন, আভিজাত্য আর আর টাকা টাকা করে ক্রমে আমার থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। ছেলেটাও টাকা ছাড়া কিছু বুঝতে চায় না। তারা সবাই আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার ভয় দেখায়। তবু আমি আমার নীতিবোধে অটল থেকেছি। একপর্যায়ে তারা দুজনেই সত্যি সত্যি আমাকে ছেড়ে চলে যায়।
নীলু চলে যায় অন্যের ঘরে আর ছেলে আমার অজান্তে আমার চাকরির কাগজপত্র ব্যবহার করে আমার নামে ব্যাংক থেকে চল্লিশ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়ে অন্য শহরে বসত গড়ে। আমাকে মহাবিপদে ফেলে। ছেলের অভিযোগ আমি নাকি তার মায়ের সাথে দুর্ব্যবহার করেছি তার শাস্তি স্বরূপ সে এ কাজ করেছে।
তবু আমি আমার জায়গা থেকে নড়েনি। আমার সব চলে গেলেও আমি আমার বোধের জায়গায় আমি ধীর স্থির।
সেই থেকে আমি একাকী নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করছি।
আমি জানি আলো যখন প্রজ্বলিত হয় তখন বহু পতঙ্গ আলোর টানে আলোর চারপাশে চলে আসে। কিন্তু তীব্র আলো তারা বেশীক্ষণ সহ্য করতে পারে না। একসময় হয় আলোয় পুড়ে মরে যায় নইলে উড়ে অন্যত্র চলে যায়। তবু আলো তার পূর্ণ শক্তিমত্তা নিয়ে জ্বলেই যায়।
আমি আমার চেতনার দৃঢ়তার সাথে কোনো আপোষ করি নি।
আমি ধর্মকে আমার মতো করে সমর্থন করলেও ধর্ম ব্যবসাকে চিরকাল ঘৃণার চোখে দেখেছি।
মানুষ তার অন্তরকে পবিত্র করার জন্য ধর্ম চর্চা করবে। মানুষ ধর্মকে মনেপ্রাণে ধারণ করবে কিন্তু ধর্মকে যদি গিলে খায় তবেই কুপমন্ডুকতায় পেয়ে বসে।
একবার আমি এক ধর্মসভার ধর্ম গুরুর কাছে প্রশ্ন করেছিলাম আপনি তো বেশ ভালো বক্তা। বেশ গুছিয়ে বক্তব্য দেন। ইনিয়ে বিনিয়ে অনেক উপদেশমূলক কথা বলেন। নিজে মলম মেখে কেঁদে অন্যদের কাঁদান। সবই ভালো। কিন্তু আপনি যেহেতু ধর্ম প্রচারের জন্য নিজেকে নিয়োজিত করেছেন তাহলে বড় অংকের টাকার চুক্তি করে কেন আসেন? ধর্ম কি বিক্রি করছেন? মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ), মহাপ্রভু গৌরাঙ্গ, মহাপ্রভু নিত্যানন্দ বা অন্যান্য ধর্ম প্রবক্তারা কি টাকার বিনিময়ে ধর্ম প্রচার করেছেন? আমি জানলাম আপনার বিলাসবহুল বাড়ি আছে, গাড়ি আছে বিলাসী জীবন যাপন করেন। তাহলে এই আমজনতাকে ধুলায় গড়াগড়ি দেওয়ার উপদেশ দেন কেন? নিজে যা পালন করেন না অন্যকে তা পালন করার পরামর্শ দেন কেন?
আমি সেই সব ধর্মগুরুর কাছ থেকে কোনো সদুত্তর পাইনি। তারা যা বলেছে তা তাদের গোঁয়ার্তুমি।
আমি ঐসব গোঁয়ার্তুমি ধর্ম ব্যবসায়ী যারা ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে। ধর্মের অপব্যাখ্যা করে তাদের বিরুদ্ধে কলম ধরি।
রুমটিতে থমথমে ভাব বিরাজ করছিল। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল তার কথাগুলো।
এর মাঝে একজন বলে বসলো আপনি কি নাস্তিক না আস্তিক।
উনি বললেন, তুমি বেশ বলেছো। যে জায়গাটায় তোমাদের মূল সমস্যা সেখানেই তুমি প্রশ্ন করেছো। এ বিষয়টিই আমার প্রতিটা লেখায় উঠে এসেছে।
আসলে আস্তিক নাস্তিক বলে কিছু নেই। এটা আমাদের বিভ্রান্ত করার জন্য বলা হয়। মূল বিষয় হলো বিশ্বাসের বৈচিত্র্যতা। তোমার ভিতর বিশ্বাস কতটুকু যুক্তিভিত্তিক, কতটুকু স্বচ্ছ, কতটুকু পোক্ত।
আমি সত্যে বিশ্বাস করি, বিজ্ঞানে বিশ্বাস করি, ধর্মে বিশ্বাস করি কিন্তু অন্ধবিশ্বাস চিরকাল ঘৃণা করি।
আমি জেনে বুঝে বিচার বুদ্ধি করে সত্যকে ধারণ করি।
আর একটা কথা মনে রাখতে হবে অসৎ আস্তিক অপেক্ষা সৎ ও নীতিবান নাস্তিকও অনেক গুন ভালো।
আরেকজন প্রশ্ন করলো তাহলে মানুষের জন্ম-মৃত্যু রহস্যটা কি?
উত্তরে উনি বললেন, মানুষ একটা গহ্বর থেকে এসেছে এবং প্রতিটা মুহূর্ত আরেকটা গহ্বরের দিকে ধাবমান। অবসম্ভাবী এ যাত্রার অংশীদার শুধু মানুষ নয় প্রতিটি পশু পাখি প্রাণী। একটা পিঁপড়ারও যেভাবে মৃত্যু হচ্ছে একটা মানুষেরও সেভাবে মৃত্যু হচ্ছে তাহলে মানুষের মৃত্যু নিয়ে এতো কৌতুহল কেন? কেন মানুষের মৃত্যুর পরবর্তী ধাপ পিঁপড়া থেকে আলাদা ভাবা হয়? কেউ কি মৃত্যু পরবর্তী ধাপ দেখে এসে বলতে পেরেছে? তাহলে কেন এই অদৃশ্য ধাপ নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করে বর্তমান জীবনকে তুচ্ছ করা?
কেন এই পৃথিবীর বাইরে আরেকটা পৃথিবীর অস্তিত্বের চিন্তায় মশগুল থাকা?
কেন অশরীরি আত্মার একটা শরীরি রূপ দিয়ে তার পিছনে নিজেকে ছুটানো?
আমরা দেহের খোরাক যোগাতে মরিয়া হয়ে ডান হাত বাম হাত দিয়ে হাতড়াচ্ছি অথচ আমাদের জীবিত আত্মাকে ক্ষুধার্ত রাখছি।
আমরা মৃত্যুর পরের আত্মাকে ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছি অথচ জীবিত আত্মার খোরাকের যোগান নিয়ে ভাবছি না কেন?
এ প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের সবাইকে খুজতে হবে।
আরেকজন প্রশ্ন করলেন আমাদের তো অবশ্যই একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন, তাকে তো বিশ্বাস করতে হবে না কি?
উত্তরে উনি বললেন, অবশ্যই সৃষ্টিকর্তা আছেন তবে বাইরে নয়, শূন্যে মহাশূন্যে বা অন্তরিক্ষে নয়। তিনি আছেন আমাদের দেহের ভিতরেই, আমাদের হৃদয়ের কাবাঘরে। আমাদের বিশ্বাস আনতে হবে আমাদের হৃদয়ের প্রতি।
আমাদের দেহই হচ্ছে একটা বড় বিজ্ঞান ক্ষেত্র, একটা বড় ধর্ম ক্ষেত্র, একটা কুরুক্ষেত্র।
এই দেহের মধ্যেই পদার্থ, রসায়ন, জীব সব বিজ্ঞান। আবার এই দেহের মধ্যেই কোরান, বাইবেল, গীতা সব ধর্মগ্রন্থ।
এই দেহের মধ্যেই ঘটে চলছে প্রতিনিয়ত নিত্য নতুন আবিষ্কার, নিত্য নতুন যুদ্ধ, নিত্য নতুন প্রশান্তি।
তাই মনকে নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে স্থির করে যদি চৈতন্যের শক্তি বাড়ানো যায় তাহলেই কেবল স্রষ্টাকে জানা সম্ভব।
সকল শক্তির উৎস হলো প্রাণ। এই প্রাণের শক্তি বাড়লে বাড়ে মনের শক্তি। মনের শক্তি বাড়লে ঘটে আত্ম উন্নয়ন। আর এই আত্ম উন্নয়নের ফলে ঘটে বোধের উন্মেষ। আর বোধের উন্মেষ ঘটলেই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড আসে নিজের করায়ত্তে।
আমার লেখার বিষয়বস্তু এগুলো নিয়েই। এখন তোমরা ভাবো কি করবে।
এতক্ষণ ঐ মানুষগুলো রওনক সাহেবের কথা শুনতে শুনতে বিমোহিত হয়ে গেল। যেন সাময়িক সময়ের জন্য হলেও যুক্তি ও বিজ্ঞানের জগতের বাসিন্দা হয়ে গিয়েছিল।
তাদের মনের মধ্যে এক দ্বান্দিক সংঘাতের ঝড় বয়ে গেল।
সবাই শান্তচিত্তে বললেন স্যার আপনার কথায় আমাদের যেমন অনেক মনঃদন্দ্ব তৈরি হয়েছে তেমনি আবার অনেক মনঃদন্দ্বের অবসান ঘটেছে। আপনি একটা বোধিবৃক্ষ। আপনাকে যত ঝাড়া দেওয়া হবে ততই ফল পড়বে।
আমরা আপনাকে ভালো করে না জেনে না বুঝে অনেক কষ্ট দিয়েছি। ক্ষমা করবেন আমাদের। আজকের মতো বিদায় নিচ্ছি। আবার প্রয়োজন পড়লে আসব আপনার কাছে বোধিবৃক্ষের ফল ভক্ষনের জন্য।