“দেখেন আমার ল্যাপটপটা সমস্যা করছিলো তাই আপনার সিটে বসছি। আমি শুধু আমার ল্যাপটপের সমস্যাটা ধরার জন্য আপনার ল্যাপটপের সাহায্য নিতে চাইছিলাম। অন্য কোনো প্লান ছিলো না আমার।.. বিনয়ী স্বরে বলেন রমিজ সাহেব।
রমিজের কথা তুচ্ছ করে মিলন সাহেব বলতেছেন “চুপ থাকেন আপনি, বেস কয়েকদিন ধরে আপনার হাবভাব ঠিক দেখছি না আমি। আজ সত্যি সত্যি তা ঘুচে গেলো।”
মিলন সাহেবের কথার প্রতিউত্তর দিতে পারছে না রমিজ সাহেব। কেনো না তিনি মিলন সাহেবের অনুমতি ছাড়াই তার অনুপস্থিতে তার সিটে বসে ল্যাপটপ ঘাটছিলেন। এটা তিনি ঠিক করেন নি জানলে অফিসের বস তাকে শাস্তি দিতে পারেন। কিন্তু ভিতরে ভিতরে তিনি খুইব উত্তেজিত। সব কিছু ছিড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে। তাই তিনি মনে মনে সব রাগ ঝাড়ছেন। কিন্তু কেউ তা শুনছে না। ঝগড়াটে মানুষ ঝগড়া করতে না পারলে স্বস্তি পায় না। মনের পোটে প্রাণীটি ভেতরেই রয়ে গেল।
অবশেষে বাসায় ফেরার পর তার বৌ শেফালী দরজা খুলতেই প্রাণীটি বেরিয়ে এলোঃ এতক্ষণ লাগে দরজা খুলতে? কানে কি বদনা দাও নাকি? সারাদিন কাজ করে বাসায় এসে আবার বাইরে এতক্ষণ দাড়িয়ে থাকতে হবে। দায়িত্ব বলে কোন শব্দ তোমার ডিকশনারিতে নেই?
শেফালি কিছু না বলে টুকটাক এটা ওটা এগিয়ে দিচ্ছে। রমিজের সেই প্রানীটি কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না।
বলেই যাচ্ছে, “কী হাজিরা দেওয়া রান্না করো আজকাল, এসব কি মুখে নেওয়ার মতো? রান্নাটুকুও ঠিক মতো করতে পারো না। পারো টা কি তুমি?
রাফির স্যার আসছিলো আজ?
শেফালী নিরুত্তরই থাকলো। কোন কথাই বললো না।
রমিজ সাহেব বললো : কথা কানে যায় না? রাফি আজ পড়েছে?
এদিকে শেফালী কাঁদতে কাঁদতে আড়ালে চলে যায়। রাফি জমের ভয়ে চুপটি মেরে লুকিয়ে আছে। মাকে কাঁদতে দেখে তারাও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে।
ঠিক সেই সময়ে রমিজ সাহেবের ফোনে তার শাশুড়ির কল, কল রিচিভ করলে রমিজ সাহেবকে তার কূশলাদি জিজ্ঞেস করার সাথে সাথেই জবাব দিলেন, আমার আবার ভালো থাকা। ঘড়ে শান্তি না থাকলে পৃথিবীটাকে জাহান্নাম মনে হয়। আপনার মেয়েকে কয়েকবার জিজ্ঞেস করলাম রাফির স্যার এসেছে কি না, তার জবান বন্ধ।
ফোনের ওপার থেকে তার শাশুড়ি বলেনঃ কেন বাবা কিছু হয়েছে নাকি? প্রতিউত্তরে রমিজ সাহেব জবাব দেনঃ কি আর হবে রান্নার প্রশংসা করিনি তাই… কথা শেষ হতে না হতেই হঠাৎ রমিজের বন্ধু সাগর উপস্থিত। একই কথা তাকেও বলে ঘড়ের বউ ঠিক না হলে আরো ভালো থাকা।
শেফালী সাগরের সাথে দু-একটা কথা বলে চা আনার কথা বলে বের হতে না হতেই…রহিম সাহেব ফোড়ন কেটে বললেন, চা? তোমার বানানো চা? হয়েছে তা আর মুখে নেওয়া হবে না।
বরং ফল-টল কিছু দাও। শেফালী লজ্জিত হয়ে অন্য রুমে চলে গেলেন।
ওহে মানব জাতি, কেউ ই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয় তবে প্রত্যেকের আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্ব রয়েছে, আত্মমর্যাদা রয়েছে।
মর্যাদা এমনই, যা সৎ লোকদের কাছে সম্পদের চেয়েও মূল্যবান। আবার নিকৃষ্ট চরিত্রের অধিকারীরা ধন-সম্পদের টানে বা অন্যকিছুর মোহে মর্যাদা বা ব্যক্তিত্বকেও বিসর্জন দিতে ইতস্তত করে না।
নারীরা স্বভাবতই লজ্জাবতী।
সৎ নারীদের কাছে অর্থাৎ লজ্জাশীলা নারীদের কাছে মর্যাদা বা ব্যক্তিত্বের গুরুত্ব অনেক বেশি। আর স্ত্রীরা এই মর্যাদা সবচেয়ে বেশি তাদের স্বামীদের কাছ থেকে পেতে আসা করে।স্বামী ও স্ত্রী একে অন্যের সহায়ক ও পরিপূরক। স্বামীরা যদি তাদেরকে অমর্যাদা কিংবা অপমানিত করে, তাহলে তারা ভীষন তাড়িত হয়। তাদের দীর্ঘশ্বাস বেড়ে যায়। আর অধিকাংশ স্ত্রীদের অর্থাৎ নারীদের স্বভাব হলো, তাড়িত হলেও তা অপ্রকাশীত রাখা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তুষের আগুনের মতো ধিকি-ধিকি সে তাড়িত হওয়ার বেদনা লালন করতে থাকে। ক্ষয়ে যায় তারা। ধীরে ধীরে স্বামীর ব্যাপারে উদাসিন মনোভাব দেখা দেয়। অথচ স্ত্রী যাকে আপনি আলহামদুলিল্লাহ পড়ে তার সকল দায়-ভার বহন, তার সবচেয়ে আপন মানুষ হয়ে তাকে সুখে রাখার শপথ গ্রহন করে আপনার সাথে এনেছেন। স্ত্রী হলো আপনার জীবনসঙ্গিনী, আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষ। যে সবকিছু আপনি হ্যাঁ শুধুই আপনার জন্য নিয়ন্ত্রনে রেখে আসছে।
পারিবারিক জীবনে সুখ-শান্তি বজায় রাখতে স্বামী যেমন তাঁর স্ত্রীকে সম্মান ও মর্যাদা দেবে ঠিক স্ত্রীও স্বামীকে তার কাজ ও অবস্থানে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দেবে। তবেই সংসার জীবনে বিরাজ করবে জান্নাতি পরিবেশ।
স্ত্রীকে সম্মান করলে তা প্রেম-ভালোবাসায় পরিণত হয়।
ফলে স্ত্রীও আপনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও অনুরক্ত হয়ে পড়বে। এই সম্মান বা মর্যাদা প্রদর্শনের ব্যাপারটি কিন্তু আলাদা কোন আনুষ্ঠানিকতার মতো ঘটনা নয়। বরং উঠতে-বসতে, চলতে-ফিরতে সকল কাজে কর্মেই সম্মান প্রদর্শন করা যেতে পারে ভালোবাসা প্রকাশ করা যেতে পারে। একটা দূর্বাঘাস ও ভালোবাসার প্রতিক হতে পারে। আবার যখন বাসা থেকে অফিসের উদ্দেশ্যে রেডি হবেন, স্ত্রীকে সাথে রাখুন। যাত্রা শুরু করার আগে, স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিন।
অফিসে কাজের ফাঁকে খোঁজ নিন। বাসায় ফেরার পর দরজা খুলতেই আনমনা একটু তাকান তার দিকে। সন্তানদের জন্য খাবার নিযে আসলে সাথে তার জন্যও কিছু আনুন।স্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে বলুন, এই নাও আমার প্রিয়জনদের প্রিয়… আপনার স্ত্রী এতে কৃতজ্ঞতায় বিনয়ী হয়ে উঠবে। জিঙ্গেস করুন তোমার সব ঠিক আছে কি না। সারাদিন কেমন কাটলো, খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো হলো কিনা, সন্তানেরা জ্বালাতন করলো কিনা, এসব খোঁজ-খবর নিন।
তারপর যতোক্ষণ একত্রে বাসায় থাকেন, গল্প করুন,
তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা সম্পর্কে জানুন।
ঠাট্টা-মশকরা করেও স্ত্রীকে বিদ্রুপ করা বা অসম্মানিত করা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করুন। এতে সে সেই মুহুর্তে স্বাভাবিক অনুভব করলেও পরক্ষনে অনেক ভাবাবে তাকে। কী প্রয়োজন? ঠাট্টার পরিবর্তে বরং প্রশংসার কাব্যিক পথ বেছে নিন। ফুর্তি যদি করতে হয়, তাহলে এমন ধরনের রসিকতা করুন, যাতে আনন্দ থাকে আবার মর্যাদাও ঠিক থাকে। কোন মজলিসে কিংবা বন্ধু-বান্ধবদের সমাবেশে কখনই স্ত্রীকে খাটো করে বা অমর্যাদা করে কথা বলবেন না।
বরং তাকে সম্মান দিয়ে তার প্রশংসনীয় দিকগুলো তুলে ধরুন। এতে আপনার বন্ধু মহলেও আপনার স্ত্রীর সম্মান-মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। যার ফলে আপনারা দুজনেই সম্মানিত হবেন। আর পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ক দৃঢ় হয়। সেইসাথে দাম্পত্য জীবন ও পরিবারে সুখ-শান্তি ও সৌরভময় এক পরিবেশ বিরাজ করে।
দৈনন্দিন জীবনে মানুষ বিচিত্র ঘটনাবলীর সম্মুখীন হয়। এসব ঘটনা সবসময় সুখকর নাও হতে পারে। অফিসে বিচিত্র মানসিকতার সহকর্মী থাকে। সবাই যে বন্ধু সুলভ হবে তা নাও হতে পারে। ফলে আপনি যদি কারো কাছ থেকে কখনো অবন্ধুসুলভ আচরণ পান, তাহলে আপনার মনটা খারাপ হয়ে থাকতে পারে।কিংবা দুর্ভাগ্যবশত: আপনার গাড়িটি কোন কারনে নষ্ট হয়ে গেলো, অন্য উপায় না পেয়ে হেটেই বিক্ষুব্ধ মনে বাসায় ফিরলেন। বাসায় ফেরার পর আপনি আর কাউকে না পেয়ে বেচারী স্ত্রীর ওপর সব রাগ প্রয়োগ করলেন। আপনার ছেলে মেয়েরা আপনার আচরণ দেখে ভাবলো, বাবা তো নয় যেন এক জল্লাদ বাসায় ফিরেছে। তারা আপনার কাছে না ঘেঁষে ভয়ে পালিয়ে বাঁচলো।
এদিকে আপনার স্ত্রী আপনার জন্যে সারাদিন খেটে যে রান্নাবান্না করলো, সেই রান্নাবান্নার ছোট-খাটো স্বাভাবিক ত্রুটিতে আপনি অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করলেন, কিংবা ঘরদোর হয়তো বাচ্চারা অগোছালো করে রেখেছে এসব কারনে যদি আপনি আপনার স্ত্রীর সাথে দুর্ব্যবহার করেন, তাহলে এরচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা আর কী থাকতে পারে আপনি নিজেই আপনার সংসারকে দোজখে পরিণত করলেন। আপনার এই আচরণ মোটেই অভিভাবক সুলভ নয়, বরং একজন অত্যাচারী স্বৈরাচারের মতো।
আপনার মতো স্বৈরাচারের শোষণে আপনার পুরো পরিবার অসহ্য যন্ত্রণার শিকার হচ্ছে। আর আপনার স্ত্রী যে তার স্বামীকে দেখামাত্রই খুশী হয়ে ওঠার কথা ছিল, সে আপনার চেহারা দেখা মাত্রই বিরক্ত হয়ে উঠবে। আপনার সঙ্গ তার কাছে বিষময় মনে হবে।
ধীরে ধীরে আপনার স্ত্রী আপনার সঙ্গ ত্যাগ করতে চাইবে। বাচ্চাদের কারণে তা অসম্ভব হলে ঘৃণা করতে শুরু করবে। এর ফলে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি আপনার হবে, তা হলো আপনার এই আচরণের প্রভাব ছেলেমেয়েদের মনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে।
ছেলেমেয়েরা ধীরে ধীরে মানসিকভাবে এতটাই জটিল বা ভারসাম্যহীন হয়ে পড়তে পারে যে, তারা আপনার চেয়েও ভয়ঙ্কর কাজ শুরু করতে পারে। অপরাধ জগতে যারা প্রবেশ করে, তাদের পারিবারিক ইতিহাস অনুসন্ধান করে দেখলে এই জটিল মানসিকতার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে।
যার মূল কারণ আপনারই রূঢ় ও ভারসাম্যহীন আচরণ। আপনার সাময়িক অসহিষ্ণুতা কতো মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তা একবার ভেবে দেখুন।স্ত্রী কোনো ভুল করলে সেটা নিয়ে সন্তানদের সামনে বা বাইরের মানুষের সামনে কথা বলবেন না। একা ডেকে কথা বলুন, যাতে সে অপমানিত না মনে করেন।
সর্বোপরি একটা বিষয় আপনার সুষ্ঠুভাবে চিন্তা করা উচিত, তাহলো যেই ঝামেলা বা দুর্ঘটনায় মুখোমুখি হওয়ার কারণে আপনি রূঢ় আচরণ শুরু করলেন, সেই ঘটনার জন্য আপনার স্ত্রী কিংবা ছেলেমেয়েরা কী দায়ী? মোটেই না। বেবে দেখুন আপনার নিরপরাধ পরিবারের সদস্যদের সাথে নির্দয় আচরণ করা কি অন্যায় নয়? বুদ্ধিমানের কাজ হলো সবকিছুকে ঠাণ্ডা মাথায় মোকাবেলা করা। ধৈর্যহারা না হয়ে নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। কাজকর্ম সেরে ধীরে সুস্থে দুর্ঘটনার কথাটি আপনার স্ত্রীসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সামনে তুলে ধরলে তারা বরং কষ্টটিকে আপনার সাথে ভাগ করে নেবে। এতে সবাই কষ্টের অংশীদার হলো।
অন্যদিকে আপনাকে কতোভাবে যে সান্তনা দেয়ার চেষ্টা করবে, তাতে আপনার কষ্টকে আর কষ্টই মনে হবে না। আর আপনার সন্তানরা আপনার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠবে। প্রতিদিন তারা অপেক্ষায় থাকবে কখন আপনি বাসায় ফিরবেন। ঠিকমতো আপনি পৌঁছলেন কিনা এ ব্যাপারে তারা সদা উদ্বিগ্ন থাকবে। বাসায় আপনার আগমনে সবার মুখে হাসি ঢেউ খেলবে।
যার ফলে পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় হবে। তাই কোন সমস্যার মোকাবেলায় উগ্রতা পরিহার করে ঠাণ্ডা মাথায় সামাধান করার চেষ্টা করুন। পরিবারের সবার সাথে বিশেষ করে স্ত্রীর সাথে হাসিখুশী থাকার চেষ্টা করুন। সুন্দর আচরণ করার চেষ্টা করুন।