উফ্…………..
কী ঝামেলা ! এই বিরক্তিকর জিনিসটা আর কতদিন পুষতে হবে? যার কারণে মাটি হয়ে যায় আনন্দদায়ক মুহুর্তগুলো । হদয়ের সমস্ত সংলাপ আদিঅন্ত শেষ করতে গিয়ে যত বাধা_____ সবি সে জোগান দেয় । সে কেন আমার বেদনার্ত প্রহরগুলো বুঝতে অক্ষম? প্রাণ নেই, তাই ?
পেটের ভেতর চক্রাকারে ঘোরা গালি-গালাজগুলো হতচ্ছাড়ার মুখে উগড়ে দেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে। মনে হচ্ছে এমন পদ্ধতিতে আছাড় মারি, যাতে তার পেটের নাড়িভুঁড়ি সব বেড়িয়ে আসে । কিন্তু তার ফলাফল কী দাঁড়াবে?
তেমন কিছু না ; শুধু আমাকেই প্রায়শ্চিত্ত দিতে হবে কিছু কাল । থাক্ ,,,,। আপাতত একটু শান্ত হয়ে বসার চেষ্টা করি ।
ঘণ্টাখানেক বাদে প্রত্যহ রুটিন অনুযায়ী টিউশনিতে বেরুলাম। আশেপাশে ইতিউতি না করে হনহন করে হেঁটে চললে সাত মিনিট কয়েক সেকেন্ডে গন্তব্য ছুঁতে পারি।
হাইওয়ে রোড ঘেঁষে হাঁটছি। শাঁ শাঁ শব্দের কম্পন তুলে দেদারছে ছুটছে নানান মিশেল গাড়ি। আর বাঁশির বিরক্তিকর প্যাঁ পুঁ শব্দ ঝালাপালা করছে কর্ণকুহর ।
শহরের কথিত অত্যাধনিক জীবন যাপন আমার ভালো না লাগার এটাই প্রধানতম কারণ । বাসার বাইরে পা রাখলেই ধুলো- বালির ঝড় আর গাড়ি-ঘোড়ার বিকট শব্দ দূষণে শরীরটাও দূষিত হয়ে পড়ে। তাই সবসময় নির্জন আর শহরে অবস্থানকালে গলিঘুঁজি সন্ধান করে ফিরি ।
সোফায় বসে আছি । সামনে টেবিল । তার ওপারেই দু’টো ফাঁকা চেয়ার । আফিফ, আকিলের জন্য। তারা সহোদর দু ভাই এবং আমার ছাত্র। প্রত্যহ নিয়মানুযায়ী সোফায় কিছু সময় পর্যন্ত বসে থাকতে হয় । অতঃপর হঠাৎ আন্টি ট্রে হাতে আগমন করেন। ঠোঁটের কোণে স্মিত হাসির রেখা তুলে নম্রস্বরে সালাম দিই ।
আন্টিটাও অনেক সরল-সুবোধ মহিলা। মিষ্টি ভাষায় প্রাঞ্জল ভঙ্গিতে নানান ধরনের বাতচিত করেন আমার সাথে।
এরপর আমি চা টা খেতে খেতে উভয় ভাইকে সাকুল্যে এক ঘণ্টা পড়াই।
তবে আজ বেশিক্ষণ কালক্ষেপণ করতে হলো না। অল্পক্ষণের মধ্যেই দু’হাতের মাঝে ট্রে ধরে আন্টি আগমন করলেন। তাঁর হাস্যজ্জ্বল চেহারাটা আজ একটু বেশিই চোখে পড়ছে। ট্রেতে দৃষ্টি পড়তেই অতিরিক্ত একটা পিরিচ লক্ষ্য করলাম তাতে। সাদা-কালো মিষ্টি দিয়ে তার ফাঁকা জায়গাগুলো ভরপুর।
___জানো সাঈদ! আজ রেহানা মেয়ে সন্তানের জননী হয়েছে।
আমি পুরো বাক্যটা আন্টির হাসি ঝড়া মুখের দিকে তাকিয়ে শুনলাম। সুসংবাদটা প্রকাশ করতে পেরে তিনি কতটাই যে তৃপ্তি অনুভব করলেন, তা ওনার চেহারার আলোকজ্জ্বল দ্যুতি দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। আনন্দের আতিশয্যে বারংবার মহান রবের শুকরিয়া জ্ঞাপন করছিলেন।
রেহানা। আন্টির একমাত্র মেয়ে। থাকে উত্তরার কোন এক সিটিতে। পাঁচ বছর পূর্বে ধনাঢ্য পরিবারের চাকুরীজীবি এক ছেলের সাথে তাঁর বিবাহ হয় । কিন্তু কোন এক সমস্যার কারণে সন্তানাদির মুখ দেখতে পারছিলেন না । দাদা-দাদি দেখতে পাচ্ছিলেন না নাতি-নাতনির মুখ। এ নিয়ে তাদের নিঃসীম চিন্তার অন্ত ছিল না। অনেক চিকিৎসা করেছেন। শরণাপন্ন হয়েছেন বহু কবিরাজের। অবশেষে আল্লাহ তায়ালা তাদের উপর রহমতের বারী বর্ষণ করলেন।
___যাক্, আলহামদুলিল্লাহ!
আপু এখন কোথায় আছেন? আর শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন তো? মুখে ঈষৎ হাসি নিয়ে বিষয়টি জানার আগ্রহ প্রকাশ করলাম।___এখনো ক্লিনিকে আছে। আর ফোন-কলে যা জানতে পেরেছি, তাতে আলহামদুলিল্লাহ চিন্তা করার মত কোন বিষয় নেই । আর এখন আমরা সেখানে যাচ্ছি । আফিফ, আকিলকে আজ তোমার পড়াতে হবে না ।
___তাহলে আন্টি , আজ আমি আসি ।
বলে উঠতে যাবো, ঠিক তখন আন্টি বলে উঠলো কি ব্যাপার ? মিষ্টি খেলে না যে! আর দাঁড়াও, আমি আসছি।
এর পরের ঘটনায় আমি ব্যাপক বিস্মিত হলাম । পুরো দশ হাজার টাকা আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন । তিনার নাতির জন্য দোয়া করবো, এ প্রত্যাশায় ।
তখন রাত্রি দশটা বাজে । প্রয়োজনের সময় গুলোতে হুটহাট করে বন্ধ হয়ে যাওয়া সেলফোনটা অনেক কষ্টে সচল করতে সক্ষম হয়েছি । ফোনটা সাথে আমার কোন শত্রুতা থাকার কথা কি ? যে জন্য দুপুরবেলা মায়ের সাথে একটু আলাপ করতে দিল না। নাকি গরীবের নিয়তিগুলো এমনই হয় ! জানালার পর্দা এক পার্শ্বে জড়িয়ে রেখে গাছ পাতার ফাঁক দিয়ে চাঁদ দেখছি। কি অপরূপ ঝলমলে তার ঈর্ষণীয় রূপ! তরল আঁধারের উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে জানালার গ্রীলে পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে তার শুভ্র আলোকচ্ছটা । কিছুটা স্পর্শ করেছে আমার চোখে মুখেও।
আগামীকাল সকালের গ্রামে ফিরব। কত কিছু ভাবতে হচ্ছে সে উপলক্ষে । কিছুদিনের জন্য ঢাকা শহরের ঘিঞ্জি আবহ থেকে রেহাই পাবো, উপভোগ করবো গ্রামের অভাবনীয় সৌন্দর্য্য, কেমনে যাব ? কোন গাড়িতে সফর হবে ? ট্রেনে নাকি বাসে ? কত টাকার টিকিট হবে ? আর কোন সময় বের হলে ভালো হয়?
ভাবনায় ধরা দিচ্ছে না এসবের কিছুই। বরং ভাবছি আন্টির দেওয়া দশ হাজার টাকার প্রয়োগ স্থান নিয়ে । কী করবো? কোনটার প্রয়োজন আমার কাছে বেশি? ভাবনার এই সময়টিতে এসে হঠাৎ আব্বুর কথা স্মরণ হলো।
তিন বছর পূর্বে যখন তিনি পৃথিবী ছাড়লেন___ তারপর থেকে পরিবারের উপরে চড়াও হল নিস্তব্ধ তার শোক ছায়া। অনিয়মের খরস্রোতে চলা আমিটা কোন এক অদৃশ্য টানে নিয়মে বেড়াজালে আটকে গেলাম। মফস্বলের মায়া, নাড়ীর টান সব ছেড়ে চলে এলাম কংক্রিট, ইট-পাথর, ধোয়া দূষণের শহর এই ঢাকায় । পড়ালেখার পাশাপাশি ছোট্ট একটা সংসারের সম্পূর্ণ ব্যয়ভার সাদরে গ্রহণ করতে হলো আমায় । বড় অবাক লাগে! রিকশা চালানোর সামান্য আয় দিয়ে বাবাটা কেমনে সংসারের হাল ধরে ছিলেন।
অবশেষে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ফেললাম। আম্মার জন্য নিবো সালোয়ার কামিজ আর সংসারের কিছু তৈজসপত্র। আর সুরভির জন্য নিবো তার প্রিয় পছন্দের জিনিসগুলো অর্থাৎ লাল-সাদা কালারের জামা, গুটিকয়েক চুড়ি , ফুলতোড়া, ঝিনুক মালা, চকলেটসহ আরো কিছু।
সুরভি। আমার কলিজা! আদুরে ছোট্ট বোন ।বয়স সাত বছর কয়েক মাস হবে । সে ছোট্ট মনটাও লোভ-লিপ্সাহীন । অল্প কিছু প্রাপ্তির অবাধ আনন্দে তার চোখ জুড়ানো নিত্য দেখে কে ! জীবনের পুরোটা দিয়ে আমি তাকে ভালোবাসি। আর সেও ।
আজ সে আজ সে আম্মুর পাশে ঘুমাবে না। ঘুমের জন্য আজকে তার ভাইয়াকে দরকার। আমিও মিষ্টি আদরে তাকে কাছে টেনে নিলাম। দরদ মাখা দু হাত দিয়ে ছুঁয়ে দিলাম তার মুখাবয়ব। কিন্তু তাতেও কি তার ঢং ফুরায় ! রুপকথার গল্প, বাঘ শিয়ালের দৌড়াদৌড়ি, রাজা-রাণীর গল্প, কল্পকথা সবিস্তারে উজাড় করতে হবে তার সামনে । সে অধিক আগ্রহে ডাগর চোখে শুনতে শুনতে হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়বে। অথবা কিছু পরপরই আমার মাথা খোঁচাবে । থেমে গেলাম কেন! তার উত্তর দিতে হবে । কিন্তু আজ কেন যেন অদ্ভুত ভঙ্গিমায় নিজের হাবভাব প্রকাশ করছে সে । সাদা ফ্রকটির মাঝে আজ তাকে একটু বেশিই সুন্দর লাগছে। ঠোঁটে লিপস্টিক, চোখে কাজল এসবের কিচ্ছুটি না থাকলেও ভীষণ মায়াকাড়ছে সাদা মুখটি।
কী গল্প শুনবে আজ?
প্রশ্নটি করবার সুযোগটাও পেলাম না। বরং চমকে উঠলাম তার কথা শুনে। আমার বুকের উপর হাত রেখে নীচু স্বরে বলল______ ভাইয়া ! আমি আর কয়দিন বাঁচবো! তুমিও আমায় ঠিক কতগুলো আদর করার সুযোগ পাবে !
চকিত নয়নে তার দিকে তাকিয়েই গাল দুটি চেপে ধরলাম। কী বললি রে ! কেন? তুই কি আমাদের ছেড়ে যাবি? কোথায়!
আমার প্রশ্নের উত্তরটা পাইনি।
কারণ ঠিক তখনই আমার ঘুমটা ভেঙে গিয়েছিল । বেলকনিতে দাঁড়িয়ে কী সব ভাবতে ভাবতে কখন যে পাশের চেয়ারে বসে ঘুমিয়েছি ; ঠিক এতটা গভীর ঘুম! তা বলতে পারবো না । স্বপ্নটা দলা দলা আশংকা আর আতঙ্ক ছড়িয়ে দিল বুকটার মাঝে। কুহু কুহু শব্দে কুঁকড়ে উঠলো ব্যাকুল হৃদয়টা । স্বপ্ন কি সত্য হয় ? হয়তোবা না । স্বপ্নের বাড়ি তো ঐ ঘুম ঘরে । কিন্তু অসহ্য আর অতৃপ্তিরা সমবেত হলো হদয়াঙ্গিনায় । বাড়িতে ফোন করে একটু কথা বলি। কিন্তু রাত তো বারোটা পার! পুরো গ্রামটা এখন ঘুমের অতল খাদে নিথর দেহে পড়ে আছে। থাক্ , সকালে কথা বললেই হবে । মনটাকে সান্ত্বনা দিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। চোখটাও বুঁজেছি। কিছু ঘুম গ্রাসও করে ফেলেছে আমায় , ইতিমধ্যেই। হঠাৎ ছেদ পড়ল ঘুমে। শব্দ করে বেজে উঠলো মোবাইলটা। রিসিভারে চাপ দেওয়ার ঠিক ত্রিশ সেকেন্ডের আমি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লাম। এক্ষুনি নাকি বাড়ি যেতে হবে ! গভীর রাত। গাড়ী কি পাবো ? সকালে যাবো বললাম। কিন্তু, না ; এক্ষুনি যেতে হবে ! সমস্ত প্রতিরোধ ও প্রতিকূলতা কাটিয়ে ভোর পাঁচটায় বাড়ি গিয়ে পৌঁছলাম।
কার অনুষ্ঠান? এত্তো লোকসমাগম!
সত্যিই সেটা অনুষ্ঠান ছিল। আমার বড্ড আদুরে বোনটার বিদায়ী অনুষ্ঠান । সকলেই অভিবাদন জানিয়েছে তাকে । আমিও জানিয়েছিলাম ; চোখের অশ্রুতে ! পাজিটা তা দেখেনি । চোখাটাও খোলোনি । বলেনি চলে যাওয়ার কারণটাও ।
আর আমার আম্মুটাও ভীষণ নিষ্ঠুর। বোধহয় আমায় ভালোবাসতো না। তাঁর সমস্ত ভালোবাসা আমার বোনটাকেই শুধু দিয়েছে। আর ঠকিয়েছে আমায় !
যখন বোনটাকে তার মাটির ঘরে চিরদিনের জন্য শোয়াইয়ে বাড়ি ফিরলাম, দেখি আম্মুটাও নেই । আমাকে না বলেই উড়াল দিয়েছে না ফেরার রাজ্যে!
তারপর থেকে আমি আবারো অনিয়ম । অনিয়মের ঘোরেই আজ অশ্রুসিক্ত ভোর, অলস দুপুর, বিষণ্ণ সন্ধ্যা আর বিনিদ্র রাত্রিগুলো পারি দিচ্ছি। নিঃসঙ্গতায় । একাই ……….