ঢাকা শহরটা দেড় কোটির বেশি মানুষকে জায়গা দিয়েছে, সে ঢাকাতেই রাস্তা-ঘাটে ,পথে-প্রান্তরে এমন কিছু মানুষ আছে যারা প্রতিনিয়ত জীবন যুদ্ধে ব্যস্ত। স্থির থাকার মত জায়গা বা সময় কোনটিই নেই তাদের।
ঢাকা শহরে বস্তির সংখ্যা অনেক, যেখানে মানবেতর জীবনযাপন করছে লাখো মানুষ। বস্তির কথা আমরা খুব সহজেই ভুলে যাবো যখন আমরা রাতের ঢাকা শহরটাকে দেখবো। রাতের শহর বলতে আমি বড় হোটেল বা বিখ্যাত কোন শপিং মল এর কথা বলছি না, বলছি না কোন সাজানো গুছানো বড় বাড়ির কথা।আমি বলছি সেই সব জায়গার কথা, যেখানে আপনি হয়তো দাঁড়ানোর সুযোগ পান না বা দাঁড়িয়ে থাকতে চান না। সে জায়গাটা হতে পারে ব্যস্ত শহরের কোন ময়লার স্তপের পাশে, কোন স্টেশন এর যাত্রী ছাউনিতে বা আবর্জনা ভরা কোন মাঠে। আজকে এমন কিছু মানুষের গল্প বলবো যাদের এইসব জায়গাতে থাকার সুযোগ হয় গভীর রাতের দিকে। তবুও তাদের মানুষের গালাগাল আর পুলিশের তাড়া খেতে হয়। ওরা হচ্ছে ঠিকানাহীন কিছু মানুষ যাদের জীবন মানে যেখানে রাত সেখানেই কাত।
ছেলেটির নাম সবুর, বয়স আট কি নয়। কখনো কমলাপুর রেলস্টেশন কখনো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশের ফুটপাতে শুয়ে রাত কাটিয়ে দেয়। কখনো বন্ধুদের নিয়ে পাড়ি দেয় দেশের অন্য কোন প্রান্তে। এ সবকিছুর পেছনেই থাকে বেঁচে থাকার প্রবল ইচ্ছে। কেউ কি এই পৃথিবীতে অনাহারে মারা যেতে চায়? অবশ্যই না।
সবুর মনে করতে পারেনা তার বাবা মায়ের কথা। সবুর নামটি কে দিয়েছে সেটাও অজানা তার। সমাজের চোখে সবুর টোকাই,কখনো চোর,কুলি বা ভিক্ষুক।
ধুলাবালির এই শহরের অলি-গলিতে অনাদর-অবহেলায় বেড়ে উঠছে এমন অসংখ্য সবুর। অতীত-বর্তমান বলতে যুদ্ধকেই ওরা বুঝে আর নিকষ কালো তাদের ভবিষ্যৎ!
ফেব্রুয়ারী মাসের এক রাত, এয়ারপোর্ট রেলস্টেশন এর পাশে এক মাঠে ঘুমাচ্ছে সবুর ও তার দুই বন্ধু। সবুর ঘুমের ঘোরে প্লাস্টিকের বস্তা ছেড়ে ঘাসের উপর শুয়েছে।
ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠলো!
এসে পড়েছে গভীর রাতের ট্রেন!
সবাই উঠে পরেছে, সবুরের ঘুম ভাঙেনি এখনও। শফিকুল সবুরকে ডাকছে-
ঐ হালার পো উঠ। রাইতের খাওন অয় নায় ভালো মতো, অহন কাম আত ছাড়া অইলে কাইলকাও না খাইয়া থাহুন লাগবো!
সবুর লাল চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “কি অইছে ডাহছ ক্যা?”
জুয়েল বলল, ”ট্রেন আইয়া পরছে, কাম খুজন লাগবো”
দিনে বা রাতে এক একটা ট্রেন এলেই তিন বন্ধু ছুটে গিয়ে যাত্রীদের বলে-
-দেন ব্যাগ টাইনা দেই, যা মন চায় দিয়েন…।
অবশ্য ওরা অপেক্ষা করে গভীর রাতের ট্রেনের।
তখন আয় বেশি হয়।
মানুষ ক্লান্ত থাকে, চোখে থাকে ঘুম ঘুম ভাব।
আজ সবার কাজ মেললেও, কাজ মেলেনি সবুরের। স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা এক সুন্দরী মহিলার হাত থেকে লাগেজ টানতেই সে সবুরের গালে সর্বশক্তি দিয়ে থাপ্পড় দিয়ে দেয়। ছিটকে পরে যায় সবুর!
ফিরে এসে তবুও আরেকবার বললো-
-আফা দেন লাগেজটা নিয়া দেই, কতক্ষণ খারিয়া থাকপেন? কষ্ট অইতাছে আফনের।
ভদ্র মহিলা এবার জুতো দিয়ে পেটানোর হুমকি দেয়।
ভদ্র মহিলা কেন এমন করল সবুর কিছুই বুঝতে পারছে না, অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সে!
শফিক ও জুয়েল ঘটনা বুঝতে পেরে দৌড়ে আসে। নিয়ে যায় সবুরকে।
সবুরের কোন কাজ পাওয়া হয়নি আজকে, তবে শফিক ও জুয়েল দুই তিনটি করে কাজ পেয়েছে। একশত টাকার মত আয় হয়েছে।
ওরা বলল, “সবুর সবাই মিলা খামু, তুই কাম পাস নায় তো কি অইছে?”
আমরাও তো মাঝে মইদ্দে পাইনা।”
স্টেশনের পাশের চায়ের দোকানটা খোলা থাকে সারারাত।
দোকানে গিয়ে শফিক বলল, ”আলী বাই! দুধ চা বানাও ছয় কাপ, আর রুটি আমরা নিয়া নিতাছি যে কয়ডা লাগে।”
-ট্যাহা আছে হালারপোরা? নাকি খাইয়াই ভাগবি?
শফিক একটি পঞ্চাশ টাকা, একটি বিশ টাকা ও চারটি পাঁচ টাকার নোট
বের করে দেখায় দোকানদার আলীকে।
-কিরে তিন বান্দরের কাম আইজকা বালোই অইছে?
জুয়েল বললো ”হ আলী বাই রাইতকার টেনডা বালা মতন ধরবার পারলে,
খাওনডা বালাই অয়।”
সবুর ও তার বন্ধুরা খাওয়া শেষে আবার হাঁটা শুরু করেছে ঠিকানাহীন ঢাকায়।
এক রাতে কমলাপুর স্টেশনের পাশে একটা বাগানে ঘুমাচ্ছে সবুর,শফিক ও জুয়েল। হঠাৎ ঝড় শুরু হয়েছে। বাগানের কয়েকটা গাছ ভেঙ্গে পড়ার শব্দ হল! প্রাণপণে ছুটছে তিন বন্ধু, ওরা দৌড়ে গিয়ে উঠল স্টেশনের যাত্রী ছাউনিতে। সেখানে এক কোণে গুটিসুটি হয়ে বসে আছে একটি মেয়ে। মেয়েটির বয়স সতেরোর কাছাকাছি হবে।
সবুর জিজ্ঞেস করল, ”আফা আফনের নাম কি?”
মেয়েটা ভয়ে ভয়ে তাকাচ্ছে সবার দিকে। ওরা আরও কয়েকবার জিজ্ঞেস করার পর মেয়েটা নম বললো। তার নাম সেতু।
সবুর ও তার তিন বন্ধু এবার মেয়েটার প্রসঙ্গ বাদ দিল। আজকে তাদের কোন কাজ হয়নি। রাতের ট্রেনটা আসতেও আরও অনেক সময় বাকি। ওদের ক্ষুধা পেয়েছে খুব। ওরা সবসময় নিজেদের সাথে জুতোয় লাগানোর আঠা (ড্যান্ডি) রাখে। ক্ষুধার জ্বালা সহনীয় মাত্রার বাইরে চলে গেলে ওরা ড্যান্ডি দিয়ে নেশা করে। এরপর ক্ষুধাও টের পাওয়া যায় না আর রাতে আবর্জনার স্তূপের পাশে ঘুমানোর সময় অনেক বেশি মশায় কামড়ালেও টের পাওয়া যায় না। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় প্রচন্ড প্রহার করলেও টের পাওয়া যায় না।
সবুর,শফিক ও জুয়েল স্টেশনে বসে ড্যান্ডি দিয়ে নেশা করেছে।
ঘন্টাখানেক সময় পার হয়ে গেছে।
বৃষ্টিতে ভিজে একদল ছেলে যাত্রী ছাউনিতে এসে উঠে। স্টেশনের কোণে বসে থাকা মেয়েটির দিকে তাকাচ্ছে ওরা বারবার। যাত্রী ছাউনির ছোট বেঞ্চটাতে বসে আছে নেশাগ্রস্থ তিনটি ছেলে, সবুর, শফিক ও জুয়েল।
বেঞ্চ ধরেই উল্টে ফেলে দেওয়া হল ওদেরকে।
ওরা বৃষ্টিতে ভিজে পথ চলছে অন্যত্র যাওয়ার জন্য আর অনেক গালিগালাজ করছে।
রেললাইনের পাশের ঢালু জায়গাটাতে শুয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে তিন বন্ধু সবুর, জুয়েল ও শফিক।
নেশার ঘোরে একে অপরকে গালিগালাজ করছে ওরা।
কত সব আজগুবি গল্প করছে নিজেদের মধ্যে।
হঠাৎ কোথা থেকে যেন একটা মেয়ের চিৎকার শুনা গেল। জুয়েলের আজ সবচেয়ে বেশি নেশা হয়েছে।
জুয়েল বলে উঠলো-
-ক্যারা চিল্লায় ক্যারা? রাত অইলো ঘুমানের নিগা, কিয়ের আবার চিল্লাচিল্লি?
আবার আকাশ-কুসুম সব গল্পে মেতেছে ওরা।
পাশ কাটিয়ে চলে গেল গভীর রাতের ট্রেনটা।
ওরা ঢুলতে ঢুলতে হাঁটছে।
স্টেশনের প্রায় কাছাকাছি গিয়ে জুয়েল দাঁড়িয়ে পরলো।
-ঐ দেক এইডা হেই কি নাম জানি পদ্দা নিহি যমুনা সেতু হেই ছেড়ি না?
সবুর ও শফিক ফিরে তাকাল ও সমস্বরে বললো, “হ! এই ছেড়ি টেনের তলে পরলো কেমনে?”
জুয়েল বললো, “আমগো দেইখা কাম কি? পরছে টেনে কাঁটা, জীবনের ধান্দা শেষ। আমগো তো ধান্দা করুন লাগবো”
আজকে ওরা কেউ কাজ পায়নি, স্টেশনে পৌঁছতেই সময় শেষ।
এভাবেই ঢাকা শহরের বুকে রাতের অন্ধকারকে তুচ্ছ করে দিয়ে হেঁটে বেড়াবে কিছু মানুষ, চেষ্টা শুধুই ক্ষুধা নিবারণ করে বেঁচে থাকার।
বিষাক্ত এই শহরে এভাবেই ভেসে আসতে থাকবে অসহায় মানুষের চিৎকার, রাতের অন্ধকারে ঘটে যাবে কিছু অপরাধ।
হয়ে যাবে কিছু মৃত্যু, হবেনা কোন অভিযোগ আর না হবে কোন তদন্ত। গভীর রাতের ট্রেনটাও কিছুটা আগে বা পরে স্টেশনে এসে পৌঁছবে। বেনামে এসে পৌঁছবে মৃত্যু চিঠি।
ঘর নেই, ঘরে ফেরার তাগিদ নেই। ঘরে ফিরবে না কিছু মানুষ। পরিবারহীন-ঠিকানাহীন ওরা!